সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। একদিকে নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি জোটের সরকার গঠনের প্রক্রিয়া যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক অঙ্গনে পুনরায় ফেরার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান এবং শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভারতের ‘সবুজ সংকেত’ ও কূটনৈতিক গুঞ্জন
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ট্রিবিউন’ একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ইঙ্গিত দেন যে, নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়তো আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচন এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটিকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা নতুন নেতৃত্বের জন্য একটি বড় আলোচনার বিষয় হতে পারে।
বিএনপির অবস্থান: ‘আইনের শাসনই শেষ কথা’
১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ভারতীয় সাংবাদিকরা। জবাবে তারেক রহমান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “সবকিছু নির্ধারিত হবে আইনের শাসন (Rule of Law) নিশ্চিত করার মাধ্যমে।”
একই অনুষ্ঠানে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশমুখী হবে না, বরং জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
জয়ের সংলাপের প্রস্তাব ও শেখ হাসিনার ফেরা
বিদেশে অবস্থানরত শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ দেশের বৃহত্তম দল এবং তাদের বাইরে রেখে করা এই নির্বাচনকে তিনি স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তবে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে তিনি তারেক রহমানের সাথে আলোচনায় বসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। জয় বলেন, “তারেক রহমান একসময় দণ্ডিত ছিলেন, এখন তিনি সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। পরিস্থিতি সবসময় এক থাকে না।” তিনি আরও যোগ করেন যে, শেখ হাসিনা উপযুক্ত সময়ে অবশ্যই দেশে ফিরবেন।
মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের তৎপরতা ও উত্তেজনা
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্ধ থাকা আওয়ামী লীগ কার্যালয়গুলো পুনরায় খোলার খবর পাওয়া গেছে।
• খুলনা ও দিনাজপুর: ১৫ ফেব্রুয়ারি খুলনায় দলীয় পতাকা উত্তোলন ও প্রতিকৃতিতে মাল্যদানের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা করা হয়। দিনাজপুরেও পরিত্যক্ত কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
• পঞ্চগড়: সদর উপজেলার একটি অফিস খোলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হয়, যদিও পরবর্তীতে সেটিকে গুদামঘর হিসেবে দাবি করা হয়েছে।
• ধানমন্ডি ৩২: ১৫ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিনসহ পাঁচজন জনরোষের মুখে পড়েন, পরে পুলিশ তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে হেফাজতে নিয়ে ছেড়ে দেয়।
জুলাই বিপ্লবের বিচার ও আইনি চ্যালেঞ্জ
আওয়ামী লীগের ফেরার এই তৎপরতার মাঝে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার বিচার। গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি-১) জুলাই বিপ্লবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ একাধিক নেতার বিরুদ্ধে কঠোর সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে পলাতক থাকায় তাকে ফৌজদারি অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেখ ওমর মনে করেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর চলা জুলুম, গুম ও জুলাই অভ্যুত্থানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগে দলটিকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করা হবে একটি ঐতিহাসিক অন্যায়।
পরবর্তী ধাপ: ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে আওয়ামী লীগের আইনি মর্যাদা এবং শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নতুন সরকার কী ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
