লুই ক্যানের নান্দনিক স্থাপত্যে নির্মিত জাতীয় সংসদের পরাবৃত্তাকার ছাদের নিচে আলো ঝলমল অধিবেশন কক্ষে শুরু হলো বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা। স্পিকারের আসন শূন্য রেখে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অধিবেশন সংসদীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার কিছু পর অধিবেশন শুরু হয়। নির্ধারিত সময়ে ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের প্রায় সবাই নিজ নিজ আসনে উপস্থিত ছিলেন। আইনগত প্রক্রিয়া মেনে পাঁচ মিনিট অপেক্ষার পর সংসদ সচিব আগের সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতির বিষয়টি জানান। এরপর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অধিবেশন শুরু হয়।
তেলাওয়াত শেষে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অধিবেশনের সভাপতি নির্ধারণের প্রস্তাব দেন। ১৯৭২ সালের সংসদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে প্রস্তাব ও সমর্থনের মাধ্যমে বিএনপির প্রবীণ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতিত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে নিয়ম অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে কায়সার কামাল নির্বাচিত হন। নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে তারা দুজনই দলীয় পদ ও মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন।
এক বছর আট মাস পর সংসদ কক্ষে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য, তবে দৃশ্যপট অনেকটাই ভিন্ন। নতুন ও তরুণ মুখের উপস্থিতি যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্বও বেড়েছে। আওয়ামী লীগবিহীন এই সংসদে পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে সংসদ নেতা তারেক রহমান অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করলে সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে তাকে স্বাগত জানান। সাদা শার্ট ও ধূসর ব্লেজার পরিহিত তারেক রহমান চারপাশে তাকিয়ে হাস্যোজ্জ্বলভাবে নিজের আসনে বসেন। ভিভিআইপি গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মা সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু, মেয়ে জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। একই গ্যালারিতে ছিলেন সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
১৯৯১ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদে প্রবেশ করেছিলেন। তিন দশকের বেশি সময় পর এবার সংসদ নেতার আসনে বসেছেন তার পুত্র তারেক রহমান, যিনি ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
অন্যদিকে ৭৭ সদস্যের বিরোধী দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ও তার দলের সদস্যরা একসঙ্গে সকাল ১০টা ৫২ মিনিটে সংসদ কক্ষে প্রবেশ করেন।
অধিবেশনের শুরুতেই কার্যকর সংসদ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সরকার ও বিরোধী দলের নেতারা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “জাতীয় সংসদে দলের প্রতিনিধিত্ব করলেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি সমগ্র দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি।”
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, নিরপেক্ষতার স্বার্থে তিনি দলীয় পদ ছেড়েছেন এবং সংসদকে কার্যকর করতে সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্পিকারের নিরপেক্ষতা প্রত্যাশা করে বলেন, “সংসদ সঠিকভাবে চললে রাষ্ট্রের অন্য দুই অঙ্গও সঠিকভাবে কাজ করবে।”
তবে প্রথম অধিবেশনেই উত্তেজনার সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ঘিরে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ শুরু করলে বিরোধী জোটের সদস্যরা প্রতিবাদ জানান এবং প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। পরে তারা ওয়াকআউট করেন। প্ল্যাকার্ডে ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’সহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা ছিল।
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের পথে নতুন যাত্রা শুরু করেছে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে ঢাকায় নিযুক্ত কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
গণঅভ্যুত্থানের পর সংস্কারের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন নতুন সংসদের ওপর। বিশেষ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে সংসদের আলোচনাকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন, যা নিয়ে সংসদে নতুন বিতর্কের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা তাই যেমন নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে, তেমনি সামনে অপেক্ষা করছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা।
