মাজারে ‘একক আধিপত্য’ সামুন মাহমুদ খানের, দানবাক্সের অর্থের হিসাব, সম্পত্তি দখল নিয়ে নানা অভিযোগ

সিলেট প্রতিনিধি:

সিলেটের ঐতিহাসিক দরগাহকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সামুন মাহমুদ খান। দরগাহের একাধিক খাদেমের দাবি, তিনি দরগাহের প্রচলিত তিন পক্ষের কোনো পক্ষের সদস্য না হলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক কার্যক্রমে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছেন। সাম্প্রতিক বিতর্কের পর তাকে দরগাহ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি ওঠে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবজমিনকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক খাদেম জানান, সামুন মাহমুদ খানকে ঘিরেই বর্তমান সংকটের বড় অংশ তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করেন। তাদের ভাষ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনেকের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতেন না।

তাদের দাবি, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার পর দরগাহের মুফতি ও খাদেম অংশের শীর্ষ ব্যক্তিরা মোতাওয়াল্লি সরেকুম ফতেহ উল্লাহ আল আমানকে সামুন মাহমুদ খানকে দরগাহে না আসতে বলার জন্য চাপ দেন। পরে মোতাওয়াল্লি তাকে ফোন করে সাময়িকভাবে দরগাহে না আসার নির্দেশ দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সূত্রগুলো জানায়, সামুন মাহমুদ খান বর্তমানে ঢাকার উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরে নিজ বাসায় অবস্থান করছেন। দরগাহকেন্দ্রিক ঘটনার পর তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সিলেট ত্যাগ করেন। জানা গেছে, তার বুকে পেসমেকার স্থাপন করা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে, দরগাহের কয়েকজন খাদেম অভিযোগ করেন, গত দেড় যুগে দরগাহের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনিয়ম হয়েছে। তাদের দাবি, প্রায় ১৫ বছর আগে ঝরনাপাড় এলাকার সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য দুটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়েছিল। পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও দানবাক্স দুটি সচল রয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সংগৃহীত অর্থের কোনো স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ তাদের।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সামুন মাহমুদ খান ওই অর্থের একটি অংশ মোতাওয়াল্লিকে দিয়ে বাকি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া দানের গরু, খাসি এবং অন্যান্য সম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সামুন মাহমুদ খানের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অতীতে তিনি এসব অভিযোগের জবাবে দরগাহ উন্নয়নে অর্থ ব্যয়ের কথা বলেছেন বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।

দরগাহ-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঝরনাপাড় এলাকায় দরগাহের প্রায় ৪ শতাংশ জমিতে অস্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেলেও বর্তমানে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে এবং দখলকৃত জমির পরিমাণ প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও জমিটির মালিকানা দরগাহের এবং ব্যক্তিগত মালিকানা দাবি করার সুযোগ নেই বলে তারা উল্লেখ করেন।

সামুন মাহমুদ খানের পারিবারিক সূত্র সম্পর্কে জানা যায়, তার পিতা ওয়ালী মাহমুদ খান একসময় সিলেটের শিক্ষা কর্মকর্তা ছিলেন এবং তৎকালীন মোতাওয়াল্লি পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দরগাহের বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন। সেই সূত্রে পরিবারটি দরগাহ এলাকায় বসবাসের সুযোগ পায়।

খাদেম ও মুফতি অংশের কয়েকজনের দাবি, দরগাহ কর্তৃপক্ষ চাইলে দখলকৃত সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে পারে। তাদের মতে, শুধু সামুন মাহমুদ খান নন, দরগাহের সম্পত্তি দখল করে থাকা অন্যদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো দরগাহের একাধিক খাদেম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সামুন মাহমুদ খান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।