১০১ বছর বয়সেও জনতার ভালোবাসায় সিক্ত • নিজের স্বপ্নের পুত্রজায়ায় স্বাধীনতা দিবসের আয়োজনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী
আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া থেকে
বয়সের ভারে শরীর অনেকটাই নুয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন, হাতে ব্যান্ডেজ। তবু জাতীয় দিবসের টান থামাতে পারেনি মালয়েশিয়ার প্রবীণ রাষ্ট্রনায়ক তুন ড. মাহাথির মোহাম্মদকে। ১০১ বছর বয়সেও হুইলচেয়ারে বসে যোগ দিলেন দেশের ৬৯তম জাতীয় দিবসের বর্ণাঢ্য আয়োজনে।
সোমবার, ৩১ আগস্ট পুত্রজায়ার দাতারান পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের মেরদেকা ডে প্যারেডে মাহাথিরের উপস্থিতি দর্শকদের মধ্যে তৈরি করে বিশেষ আবেগ ও আগ্রহ। বৈদ্যুতিক হুইলচেয়ারে বসে তিনি উপস্থিত হাজারো মানুষের দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। অনেকেই এগিয়ে এসে তার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। কেউ কেউ সুযোগ পেয়ে তোলেন সেলফিও।
মাহাথিরের নিজস্ব টিকটক অ্যাকাউন্ট @chedetofficial থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিওতেও অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতির দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে তাকে বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও অভিবাদন জানাতে দেখা যায়।
নিজের স্বপ্নের শহরে মাহাথির
এবারের মেরদেকা আয়োজনে মাহাথিরের উপস্থিতি অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় যেন বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, যে পুত্রজায়া আজ মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী, সেই শহর গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে মাহাথিরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা।
কুয়ালালামপুরের বাইরে একটি নতুন প্রশাসনিক নগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনা যখন নেওয়া হয়, তখন প্রকল্পটির ব্যয় ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। সমালোচকদের কেউ কেউ এটিকে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ব্যয়বহুল প্রকল্প হিসেবেও দেখেছিলেন।
তবে সময়ের সঙ্গে পুত্রজায়ার বাস্তবতা অনেক সমালোচনার জবাব দিয়েছে। পরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা, প্রশস্ত অবকাঠামো, আধুনিক সরকারি ভবন এবং সুসংগঠিত নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে পুত্রজায়া আজ মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও প্রশাসনিক স্থাপনার বড় অংশই এখন এই শহরে অবস্থিত।
মেরদেকা দিবসের কুচকাওয়াজে হুইলচেয়ারে বসে মাহাথিরকে তাই যেন নিজের বহু বছরের পুরোনো স্বপ্নের বাস্তব রূপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বহু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পুত্রজায়া নিঃসন্দেহে তার রাষ্ট্রনায়কসুলভ দূরদর্শিতার অন্যতম দৃশ্যমান নিদর্শন।
অসুস্থতার পরও জনসম্মুখে
সাম্প্রতিক সময়ে পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার পর মাহাথিরকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য ন্যাশনাল হার্ট ইনস্টিটিউট বা ইনস্টিটিউট জান্তুং নেগারা (আইজেএন)-এ ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে ধীরে ধীরে জনসম্মুখে ফিরছেন তিনি। মেরদেকা অনুষ্ঠানে তার একটি হাত ব্যান্ডেজে মোড়ানো অবস্থায় দেখা যায়।
এর আগেও বয়সজনিত শারীরিক সমস্যার কারণে তাকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। গত বছর নিজের শততম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত ‘পিকনিক অ্যান্ড পটলাক’ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লে তাকে আইজেএনে নেওয়া হয়েছিল।
মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘ ছায়া
মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তিনি দুই দফায় দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রথম দফায় ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। এরপর ২০১৮ সালে ৯২ বছর বয়সে আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ফিরে আসেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন। দ্বিতীয় দফায় ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
তার দীর্ঘ শাসনামলে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, শাসনপদ্ধতি ও বিভিন্ন নীতিকে ঘিরে বিতর্কও কম ছিল না।
‘মেরদেকা’র সঙ্গে অটুট বন্ধন
৬৯তম জাতীয় দিবস উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় মাহাথির মালয়েশিয়ার জনগণকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জাতীয় দিবসের আয়োজনে তার উপস্থিতি মালয়েশিয়ার মানুষের কাছে হয়ে ওঠে এক আবেগঘন মুহূর্ত। বয়স তাকে ধীর করেছে, শরীর তাকে সীমাবদ্ধ করেছে, কিন্তু দেশের স্বাধীনতা দিবসের প্রতি তার টান এবং মানুষের সঙ্গে তার সংযোগ এখনো অটুট।
জনতার হাত নাড়ানো অভিবাদন, শুভেচ্ছা আর সেলফির আবদারের মধ্য দিয়ে মেরদেকার এই দিনে যেন ফুটে উঠল মালয়েশিয়ার ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়।
নিজের স্বপ্নে গড়া পুত্রজায়ায় ১০১ বছর বয়সী মাহাথিরের হুইলচেয়ারে উপস্থিতি তাই নিছক একটি জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নয়। এটি ছিল এক প্রবীণ রাষ্ট্রনায়কের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, তার স্বপ্নের বাস্তব রূপ এবং জনগণের সঙ্গে তার বহু দশকের সম্পর্কের এক আবেগঘন পুনর্মিলন।
