৮০ হাজারের বেশি মানুষের সমাগম | কুচকাওয়াজে ১০ হাজার ৮১৯ জন | আকাশে পাঁচ হেলিকপ্টারের পতাকা প্রদর্শন
আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া থেকে
কুয়ালালামপুর: লাল-সাদা-নীল পতাকার বর্ণিল সাজ, তূর্যের গম্ভীর ধ্বনি, জাতীয় সংগীত, সামরিক কুচকাওয়াজ, দেশাত্মবোধক পরিবেশনা এবং আকাশে পতাকা বহনকারী হেলিকপ্টারের মনোমুগ্ধকর প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ায় উদযাপিত হয়েছে ৬৯তম জাতীয় দিবস।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দেশটির প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ার দাতারান পুত্রজায়ায় আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে স্থানীয় নাগরিকদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিদেশি অংশ নেন। আয়োজকদের তথ্যমতে, এবারের জাতীয় দিবসের আয়োজনে ৮০ হাজারের বেশি দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছে।
১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে মালয়েশিয়া। এরপর থেকে প্রতিবছর ৩১ আগস্ট ‘হারি মেরদেকা’ বা জাতীয় দিবস হিসেবে দিনটি উদযাপন করে দেশটির মানুষ। মালয়েশিয়ার জাতীয় ইতিহাসে দিনটি গৌরব, আত্মপরিচয় ও দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
রাজা-রানির উপস্থিতিতে শুরু আনুষ্ঠানিকতা
স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় শুরু হয় জাতীয় দিবসের মূল অনুষ্ঠান। এতে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম ও রানি রাজা জারিথ সোফিয়া।
তারা দাতারান পুত্রজায়ায় পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী দাতুক সেরি ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল তাদের স্বাগত জানান। এ সময় যোগাযোগমন্ত্রী দাতুক সেরি ফাহমি ফাদজিলও উপস্থিত ছিলেন। তিনি ২০২৬ সালের জাতীয় দিবস ও মালয়েশিয়া দিবস উদযাপনের মূল কমিটির চেয়ারম্যান।
রাজা-রানির উপস্থিতিতে তূর্যের গম্ভীর ধ্বনির মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। এরপর মূল সম্মান রক্ষী বাহিনীর ব্যান্ডদল জাতীয় সংগীত ‘নেগারাকু’ পরিবেশন করে। জাতীয় সংগীতের সুরে পুরো প্রাঙ্গণে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
আকাশে পতাকা নিয়ে পাঁচ হেলিকপ্টার
রাজা ও রানি রাজকীয় মঞ্চে আসন গ্রহণের পর শুরু হয় আকাশে পতাকা প্রদর্শন। মালয়েশিয়ার জাতীয় পতাকা এবং দেশটির সশস্ত্র বাহিনী, সেনাবাহিনী, রাজকীয় নৌবাহিনী ও রাজকীয় বিমানবাহিনীর পতাকা বহন করে পাঁচটি হেলিকপ্টার।
পুত্রজায়ার আকাশে হেলিকপ্টারগুলোর দৃষ্টিনন্দন উড্ডয়ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে।
এরপর রাজা সুলতান ইব্রাহিম কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং মূল সম্মান রক্ষী বাহিনীর কাছ থেকে রাজকীয় অভিবাদন গ্রহণ করেন। সাঙ্গাই বুলোহ ক্যাম্প থেকে আসা আনুষ্ঠানিক রাজকীয় গোলন্দাজ রেজিমেন্টের ৪১তম ব্যাটারি এ অভিবাদন প্রদান করে। এতে তিনজন কর্মকর্তা ও ৫৭ জন সদস্য অংশ নেন।
কুচকাওয়াজে ১০ হাজার ৮১৯ জন
এবারের জাতীয় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মালয়েশিয়া মাদানি: সমৃদ্ধির সুফল সবার জন্য’। এ প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য, শান্তি, সমৃদ্ধি ও নাগরিক কল্যাণের বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজে ৭৬টি দলের মাধ্যমে অংশ নেন মোট ১০ হাজার ৮১৯ জন। কুচকাওয়াজের সঙ্গে ছিল ২২টি ব্রাস ব্যান্ড।
বিভিন্ন বাহিনী, সরকারি সংস্থা ও সংগঠনের অংশগ্রহণে আয়োজিত কুচকাওয়াজে দেশটির জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের চিত্র ফুটে ওঠে।
তৃতীয়বার জাতীয় দিবসের আয়োজনে রাজা-রানি
মালয়েশিয়ার ১৭তম রাজা হিসেবে সুলতান ইব্রাহিম দায়িত্ব নেওয়ার পর এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো তিনি ও রানি রাজা জারিথ সোফিয়া জাতীয় দিবসের বর্ণাঢ্য আয়োজন প্রত্যক্ষ করলেন।
২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি সুলতান ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার রাজা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। একই বছরের ২০ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে তার অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়।
রাজা-রানির উপস্থিতি, হাজারো মানুষের অংশগ্রহণ, সামরিক কুচকাওয়াজ, দেশাত্মবোধক পরিবেশনা এবং আকাশে পতাকা বহনকারী হেলিকপ্টারের প্রদর্শনে এবারের মেরদেকা উদযাপন পরিণত হয় জাতীয় গৌরব ও ঐক্যের এক বর্ণাঢ্য আয়োজনে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব
মালয়েশিয়ার জাতীয় দিবস উদযাপনের এই আয়োজনের সঙ্গে বাংলাদেশেরও রয়েছে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়াই প্রথম এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যেও প্রথম সারির দেশ হিসেবে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয়।
১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক শ্রমবাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কও আরও বিস্তৃত হয়েছে। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের অর্থনৈতিক ও জনসম্পৃক্ত সম্পর্ক জোরদারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী হবে।
