যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির অভ্যন্তরে নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতর যখন প্রশ্ন উঠছে এবং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং (Wes Streeting) মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দিয়েছেন, ঠিক তখনই বিভিন্ন জনমত জরিপের তথ্যে স্ট্রিটিংয়ের জন্য একটি বড় ধাক্কা সামনে এসেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, লেবার পার্টির সাধারণ সদস্যদের মাঝে মাত্র ৪% সদস্য চান ওয়েস স্ট্রিটিং দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসুন। এমনকি কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে সরাসরি তুলনায়ও স্ট্রিটিং অনেক পিছিয়ে রয়েছেন।
স্কাই নিউজের রাজনৈতিক বুলেটিন এবং পোলিং সংস্থাগুলোর (যেমন Survation ও YouGov) সাম্প্রতিক জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, লেবার পার্টির সাধারণ সদস্যদের মধ্যে ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা খুবই সীমিত।
দলের মূল নেতৃত্ব বা এককভাবে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে দেখতে চান—এমন প্রশ্নে মাত্র ৪% সদস্য স্ট্রিটিংয়ের প্রতি সরাসরি আস্থা প্রকাশ করেছেন।
যদি কিয়ার স্টারমারের সাথে ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের সরাসরি (Head-to-Head) তুলনা করা হয়, সেখানেও স্ট্রিটিং মাত্র ২৩% সমর্থন পাচ্ছেন, যেখানে স্টারমার পাচ্ছেন ৫৩%। অর্থাৎ, দলের বড় একটি অংশ স্টারমারের ওপর অসন্তুষ্ট হলেও স্ট্রিটিংকে তারা বিকল্প ভাবছেন না।
এতে স্পষ্ট হয়েছে যে, স্টারমারের জনপ্রিয়তা কমলেও দলের তৃণমূল এখনো স্ট্রিটিংকে বিকল্প হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়।
ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের এই চরম জনপ্রিয়তাহীনতার মূল কারণ গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম (Andy Burnham)। লেবার পার্টির সদস্যরা কিয়ার স্টারমারের বিকল্প হিসেবে বার্নহামকে সবচেয়ে যোগ্য মনে করছেন।
মেকারফিল্ড (Makerfield) উপ-নির্বাচনে জিতে বার্নহামের পার্লামেন্টে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জরিপ বলছে, প্রায় ৬০% লেবার সদস্য বার্নহামকে সমর্থন করছেন। এমনকি স্টারমার বনাম বার্নহামের সরাসরি লড়াই হলে স্টারমারকে হারিয়ে বার্নহামের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট। ফলে স্ট্রিটিংয়ের জন্য এই পথ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্ট্রিটিংয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দলের বামঘেঁষা ও শ্রমিকপন্থী সদস্যদের আস্থা অর্জন করতে না পারা।
তিনি অনেকটা সাবেক প্রধানমন্ত্রী Tony Blair-এর মধ্যপন্থী (Blairite) রাজনীতির অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এনএইচএস সংস্কার এবং স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ নিয়ে তার কিছু বক্তব্য লেবারের বামপন্থী অংশকে ক্ষুব্ধ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি বার্নহাম জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে ফিরে আসেন, তাহলে স্ট্রিটিংয়ের নেতৃত্বের স্বপ্ন আরও কঠিন হয়ে যাবে।
লেবার পার্টির ভেতর গৃহবিবাদ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ডানপন্থী Reform UK জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং ব্রিটেনজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয়, এনএইচএস সংকট ও অভিবাসন ইস্যুতে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
লেবারের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আশঙ্কা, অভ্যন্তরীণ এই দ্বন্দ্ব সাধারণ ভোটারদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
স্কাই নিউজের বিশ্লেষকদের মতে, ওয়েস স্ট্রিটিং একজন দক্ষ বক্তা এবং মিডিয়ায় পরিচিত মুখ হলেও, শুধুমাত্র মিডিয়া জনপ্রিয়তা দিয়ে লেবার পার্টির নেতৃত্ব পাওয়া সম্ভব নয়। তৃণমূল কর্মী ও ইউনিয়নভিত্তিক সমর্থন ছাড়া দলের শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছানো কঠিন হবে।
ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের নেতৃত্বে আসার ঘোষণা ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করলেও বাস্তবতা এখনো তার পক্ষে নয়। মাত্র ৪% সদস্যের সমর্থন দেখিয়ে দিচ্ছে, লেবার পার্টির ভেতরে তার সামনে এখনো দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ বাকি। অন্যদিকে অ্যান্ডি বার্নহামের উত্থান এবং কিয়ার স্টারমারের বর্তমান অবস্থান মিলিয়ে লেবারের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের লড়াই আরও নাটকীয় হতে যাচ্ছে।
ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ এবং নিজেকে নেতৃত্বের দৌড়ে শামিল করার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ প্রমাণিত হচ্ছে। স্কাই নিউজের তথ্য এবং মাত্র ৪ শতাংশের এই চরম হতাশাজনক সমর্থন এটাই ইঙ্গিত করে যে—ওয়েস স্ট্রিটিং যদি সত্যি লেবার পার্টির ডাউনিং স্ট্রিটের স্বপ্ন পূরণ করতে চান, তবে তৃণমূলের মন জয় করতে তাকে অলৌকিক কিছু করে দেখাতে হবে। অন্যথায়, এই লড়াইয়ে তিনি অ্যান্ডি বার্নহাম বা কিয়ার স্টারমারের কাছে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়বেন।
