চীন-রাশিয়ার ‘সীমাহীন বন্ধুত্ব’: শক্তির ভারসাম্যে এগিয়ে বেইজিং

চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin নিজেদের সম্পর্ককে বহুবার “সেরা বন্ধু” ও “সীমাহীন বন্ধুত্ব” হিসেবে তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি বেইজিংয়ে দুই নেতার এক অনানুষ্ঠানিক আলাপ সেই ঘনিষ্ঠতার নতুন আভাস দিয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে তিয়ানআনমেন স্কয়ারে হাঁটার সময় শি ও পুতিন মানবদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং মানুষের আয়ু দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। খোলা মাইক্রোফোনে ধরা পড়া সেই কথোপকথন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এদিকে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ‘প্রতিবেশী হিসেবে সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা’ চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আবারও বেইজিং সফরে যাচ্ছেন পুতিন। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা চাপের মুখে দুই দেশের সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের প্রভাব বাড়ছে

বিশ্লেষকদের মতে, চীন-রাশিয়া সম্পর্ক এখন অনেকটাই অসম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিকভাবে চীন রাশিয়ার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া ক্রমেই চীনের বাজার, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, শিল্প ও যুদ্ধ সরঞ্জামের বিভিন্ন উপাদানের ক্ষেত্রেও বেইজিংয়ের ওপর মস্কোর নির্ভরতা বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এই নির্ভরতা আরও গভীর হয়েছে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া প্রকাশ্যে নিজেকে “জুনিয়র পার্টনার” হিসেবে দেখতে না চাইলেও বাস্তবে চীনের সমর্থন ছাড়া তাদের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

জ্বালানি ও সামরিক সহযোগিতা

চীনের জন্য রাশিয়ার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো জ্বালানি ও সামরিক সহযোগিতা। ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন বাস্তবায়িত হলে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস চীনে সরবরাহ করা হবে।

এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা চীনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে সম্ভাব্য তাইওয়ান পরিস্থিতি নিয়ে বেইজিং কৌশল নির্ধারণে রাশিয়ার যুদ্ধকে পর্যবেক্ষণ করছে চীন।

আনুষ্ঠানিক জোট নয়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও এটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়। বরং এটি একটি “নমনীয় কৌশলগত অংশীদারিত্ব”।

দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায় একই অবস্থান নেয়। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীন তুলনামূলক বেশি সতর্ক ও বাস্তববাদী অবস্থান অনুসরণ করে, যেখানে রাশিয়া অনেক বেশি সংঘাতমুখী।

জনগণের সম্পর্কেও পরিবর্তন

রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও যোগাযোগ বাড়ছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর ভিসানীতির কারণে অনেক রুশ নাগরিক এখন চীনের দিকে ঝুঁকছেন।

চীনে ভ্রমণ সহজ হওয়া, চীনা প্রযুক্তিপণ্য ও গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করছে।

তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা থাকলেও সাংস্কৃতিকভাবে রাশিয়া ও চীনের জনগণের মধ্যে এখনো বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে।

সম্পর্ক ভাঙার সম্ভাবনা কম

বিশ্লেষকদের মতে, চীন-রাশিয়া সম্পর্কের মধ্যে অসমতা ও মতপার্থক্য থাকলেও স্বল্পমেয়াদে এই অংশীদারিত্ব ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ দুই দেশেরই একে অপরকে প্রয়োজন এবং বিকল্পও সীমিত।

সূত্র: BBC News Bangla